একজন সুখী মানুষ

ফরিদ উজ্ – জামান পলাশ

মার্চের মাঝামাঝি। এখনো তেমন গরম পড়ে নি। কিন্তু দুপুরের রোদে গায়ের চামড়া পুড়ে যাওয়ার অবস্থা। গরম যখন আরো বাড়বে তখনকার কথা ভাবতে থাকে শাহেদ আলী। পুরান থানা বাজারের গলির মূখে শরীরের ছোট-খাটো অসুখের মতই রোদকে অগ্রাহ্য করে রিক্সায় বসে আছে শাহেদ আলী। শরীরে কুলায় না। কিন্তু পেটের দায়ে কী আর করা। 
–চাচা মিয়া যাবেন?

বেশ মোটামতো এক তরুণী জিজ্ঞেস করে।

— যায়াম। কই যাইবাইন মায়া?

 — হারুয়া। নিরালা গলি।

 –উডুইন।

— ভাড়া কত?

শাহেদ আলী হেসে বলে, — ভাড়া যা খুশি দিলেই অইলো।

— না না। আগে কথা বলে নেয়া ভালো। নয়তো আবার…। ১৫ টাকা দেবো। চলবে?

— ঠিক আছে। উডুইন।

তরুণীর নাম রোজা। রমযান মাসে জন্মেছিল বলেই হয়তো তার নাম রোজা।স্বামীর সাথে একমাত্র সন্তান নিয়ে আমেরিকা থাকে। টাকা-পয়সার অভাব নেই। খরচও করে। তবে সব জায়গায় নয়। ক্ষেত্র বিশেষে হিসেব করে চলে বৈকি! শাহেদ আলীর রিক্সাটি ব্যাটারি চালিত নয়। টানতে বেশ বেগ পেতে হয়। জীবন নাটকের শেষ অংকে এসেওসে বুঝতে পারছে না এর পরিণতি কী!অভাবের কারণে তিন ছেলের কাউকেই লেখা-পড়া করাতে পারে নি। ছেলেরা ১৬/১৭ বছর বয়স হতেই বিয়ে করে সংসার শুরু করে দিয়েছে। বুড়ো বাপ- মা’কে দেখার সময় কই?  কারো প্রতিই কোন অভিযোগ নেই তার। আল্লার কাছে একটাই চাওয়া, তার মৃত্যু যেন হঠাৎই হয়ে যায়। বিছানায় পড়ে যেনো কষ্ট করতে না হয়। শাহেদ আলীর কোন দূঃখ নেই। তার ধারণা দূঃখগুলো ঘাম হয়ে বেরিয়ে যায় শরীর থেকে।

— চাচা মিয়া ডানে যান। শাহেদ আলী সম্বিৎ ফিরে পায়। গলির ভিতরে কিছুদূর গিয়েই রিক্সা থামে।

–চাচা মিয়া, আমার কাছে ১৫ টাকা ভাঙতি নাই। ২০ টাকা আছে। আপনার কাছে পাঁচ টাকা আছে?

— না গো মায়া। একটু আগেই একজনরে সব ভাঙতি দিয়া দিছি। 
— তাহলে এই নিন। ১০ টাকা নিয়ে দাঁড়ান,  আমি বাসা থেকে আসছি।

— আইচ্ছা। শাহেদ আলী দাড়ায়। প্রায় ১০ মিনিটেও ফিরে আসার নাম নেই। 
–চাচা মিয়া যাবেন?এক ভদ্রলোক জানতে চান। বয়স চল্লিশের মতো হবে। 
— কই যাইবাইন?

–পুরান থানা।

–হ। উডুইন।

শাহেদ আলী চলতে শুরু করে। বেশ কিছুটা চলার পর পেছন থেকে ডাক আসে।

— চাচা মিয়া! আপনার পাঁচ টাকা। শাহেদ আলী পিছনে তাকায়। মৃদু হেসে হাত ইশারা করে। অর্থাৎ এ টাকায় তার কোন দাবি নেই। 
রোজা চারদিক খেয়াল করে। কেউ দেখেনি ত আবার?  আজকাল মানুষ সমালোচনার জন্য মূখিয়ে থাকে। একটা কোন উপায় পেলেই হলো। হয়তো কেউ তার নামের সাথে কিপ্টে শব্দটি জুড়ে দিতে চাইবে। কেউ দেখে নি বলে সে স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলে ঘরে ফিরে যায়। 
তাজ রেস্টুরেন্টের সামনে আসতেই রিক্সা থামলো। ভদ্রলোক রিক্সা থেকে নেমে পঞ্চাশ টাকার নোট বাড়িয়ে দিলেন। –আমারটেন ভাঙতি নাই বাজান।

— ভাঙতি তো আমার কাছেও নাই।

–ভাঙ্গায়া দেইন।

 — ভাড়া কত?

— আপনি যাই দেন।

— ঠিক আছে। আপনি পুরোটাই রেখে দিন। বলেই ভদ্রলোক ভীড়ের মধ্যে হারিয়ে যায়। তার মূখটা ভালো করে দেখতে পারে নি শাহেদ আলী । রিক্সা নিয়ে চা স্টলের দিকে এগিয়ে যায়। 
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে সমিনা খাতুন এর সাথে সারাদিনের জমানো কথা হবে। দিনভর খাটুনির পর বিছানায় পিঠ লাগাতেই রাজ্যের ঘুম নেমে আসবে। শাহেদ আলী সুখী মানুষ। আহা সূখ! ঘুমের দেশে তলিয়ে যেতে যেতে শাহেদ আলী বলে, “সুখী হোক দুনিয়ার মানুষেরা। সুখী হোক সবাই। “

Leave a Reply

%d bloggers like this: