এদশকের কবিরা কবিতাকে বিমূর্ততার দিকে নিয়ে গেছে- মীর রবি

কাল পরিক্রমায় থেমে নেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, থেমে নেই কবিরাও। কবিতার নিরীক্ষা ও প্রচল ভাঙার মিছিলে শামিল হয়েছেন যে কজন কবি, যাদের কবিতা ইতোমধ্যে পাঠকের আলোচনায় উঠে এসেছে যাদের নাম, তাদের মধ্যে মীর রবি অগ্রগণ্য। কবিতার প্রকরণ, ব্যাকরণ ও প্রাঞ্জলতার পাশাপাশি সামঞ্জস্য মিথের শব্দগভীর ব্যবহারে কবি হয়ে উঠেছেন প্রিয় সব কবিতার জনক। প্রকাশিত বই অ্যাকোয়ারিয়ামে মহীরুহ প্রাণ, ইরেজারে আঁকা ব্ল্যাক মিউজিক ও ক্রস মার্কার। সম্পাদনা করেন ছোটকাগজ ঠোঙা। যুক্ত ছিলেন দৈনিক খোলা কাগজের সাহিত্য সম্পাদক হিসেবেও। পেয়েছেন সিটি আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার ২০১৮। মীর রবির সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- আবু জাফর সৈকত।

আবু জাফর সৈকত : আপনার লেখার শুরুটা কীভাবে?

মীর রবি : ছোটবেলায় আমি প্রচুর ছবি আঁকতাম। সেটা প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময়কার কথা। ছবি এঁকে এঁকে একজন দাদুকে দেখাতাম। তিনি স্কুল শিক্ষক ছিলেন। মীর আবুল কাশেম। এই দাদুই আমাকে দিয়ে বিভিন্ন বই ও পত্রিকা আনাতেন। সেসবে রূপকথার বইও থাকত। পত্রিকায় ছোটদের পাতাও দেখতাম আর পড়তাম। এখান থেকেই সাহিত্যের প্রতি আগ্রহটা সেই সঙ্গে লেখার শুরুটাও। ক্লাস ফাইভে থাকার সময় কবি জসিম উদ্দদিনের ছুটির দিনে ছড়াটা নকল করে একটা ছড়া লিখেছিলাম বাংলা ভাষা নামে। এইযে শুরু, এরপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি।

আমার প্রথম লেখা ছাপা হয়েছিল একটি ভাঁজপত্রে। এরপর রংপুরের একটি দৈনিকের শিশুপাতায়। তবে বড় অনুপ্রেরণাটা আসে দৈনিক ইত্তেফাকের কচিকাঁচার আসরে লেখা ছাপা হওয়ার পর। তখন আমি নিম্ন মাধ্যমিকের ছাত্র। পাতাটা দেখতেন শিশু সাহিত্যিক খালেক বিন জয়েন উদ্দিন। আমার লেখা পেয়ে তিনি ফোন করেছিলেন । প্রশংসা ও উপদেশ দুটাই পেয়েছিলাম তার কাছ থেকে। এইযে বিখ্যাতজনের আশকারা পাওয়া, সেটাই আমার জন্য আশীর্বাদ হয়ে ধরা দিল।

কবিতার ধ্রুপদী প্রকরণ আপনাকে কতটা টানে বা টানে না?

কবিতার ধ্রুপদী বলতে ট্রাডিশনাল ফরমের কথা যদি বলেন, বলব এটা নিয়ে আমার তেমন কোনো ভাবনা নেই। ধ্রুপদী ঘরোনার যেসব কবিতা পড়ি তার কিছু ভালো লাগে আবার কিছু ভালো লাগে না। ব্যপারটা আসলে ভালো লাগা না লাগার । কখনো টানে, কখনো টানে না এমন। তাছাড়া সবার যে সবটা ভালো লাগবে এমন নয়। ব্যক্তি বিশেষে এটা কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন। আমার লেখার ক্ষেত্রে এটাকে আমি এড়িয়ে চলি। আমার চিন্তাটাই হচ্ছে প্রোজপোয়েট্রি নিয়ে। এটাই আমাকে বেশি টানে। তবে কবিতা চর্চার শুরুর দিকটার কথা যদি বলি, তবে আমি কিন্তু ধ্রুপদী কবিতার কাছেই ঋণী। এসব কবিতা পাঠ করেই আমি লিখতে এসেছিলাম। শুরুতে লিখতামও সেই ধারায়।

প্রথম ও দ্বিতীয় দশকের কবিতার কোনো মৌলিক পার্থক্য লক্ষ করেন যা দিয়ে দুটো দশককে আলাদা ভাবা যায়?

প্রথম দশকের কবিতার কথা বললে বলতে হয়- এদশকের কবিরা কবিতাকে বিমূর্ততার দিকে নিয়ে গেছে। ঠিক যেরূপটা আমরা বিমূর্ত চিত্রকলায় দেখি। আশি ও নব্বইয়ের কবিতা থেকে তাদের এই যাত্রাটা কিন্তু ভিন্ন গতিপথের। ভাবনা-চিন্তা ও কল্পনার চিত্রায়নে তারা একধরণের কোলাজ তৈরি করেছে, যা আমাদেরকে একটি কবিতায় বিচিত্র ভাবনা-চিন্তার অলিগলিতে ঢুকিয়ে দেয়। একেবারে নির্দিষ্ট কোনো ভাবনা বা চিন্তা পাই না। বলব বহুমূখী দর্শনের যাত্রা। যা আমাদেরকে অন্ধকার ঘরের ভেতর ছেড়ে দেওয়ার পরবর্তী দৃশ্যকল্পের ইঙ্গিত কওে, যাতে একক কোনো সত্তা নেই। আর দ্বিতীয় দশকের কবিতার কথা বলতে গেলে বলতে হয় এই সময় পর্বের কবিরা কখনো ট্রাডিশনাল কখনো প্রোজপোয়েট্রির দিকে যাওয়া আসার ভেতর কোনো একটাতে স্থির নয়। পলিটিক্যাল ভিউয়েও এরা অস্থির। পলিটিক্যাল অসচেতনাও লক্ষ্য করা যায় অনেকের কবিতায়। একেবারে সরলিকরণ আবার গল্পের ঢংয়ে কবিতা বুনন বা অনেকটা বিমূর্ততা এই প্রজন্মের কবিতাকে চাঞ্চল্য করে তুলেছে। মৌলিক পার্থক্য বলতেও আমি এসবকেই নির্দেশ করব। আমার ব্যক্তি মতে প্রথম দশকের দিক থেকে দ্বিতীয় দশকের কবিতা আমাদেরকে আরো নতুনত্বের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যেমনটা ফারহান ইশরাকের কবিতা থেকে হাসনাত শোয়েবের কবিতা।

আপনি নিজেকে কোন দশকে ভাবেন বা আদৌ ভাবেন না?

আমি দশকের ট্যাগে থাকতে রাজি নই। আমি নিজেকে সব সময় পর্বের কবি বলে ভাবতেই পছন্দ করি।

হাংরি, শ্রুতি, নীম, কৌরব, রৌরব, নতুন কবিতা এইসব আন্দোলন কবিতাকে কতটা বদলিয়েছে?

আন্দোলন কবিতাকে কতটুকু বদলিয়েছে তা নিয়ে বিতর্ক আছে। এসব কবিতা আন্দোলন স্বতন্ত্র বাংলা কবিতা বলতে যা বোঝায় সেই দিক থেকে কোনো বদল ঘটায়নি। বরং আমাদের কবিতাকে ইউরোপিয়ান কবিতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। যা স্বভূমি থেকে পরাধীনতারই দিকে যাত্রাকে বোঝায়। আমাদের কবিতা বলতে আমি তো আমাদের ভূগোল, আমাদের লোকসমাজের গন্ধমাখা কবিতাকে বুঝি। যা ঐসব কবিতা আন্দোলনের কবিতায় খুঁজে পাই না। হাংরি, নীম, শ্রুতি, কৌরব, রৌরব বা নতুন কবিতা আন্দোলনের কবিতাকে আমাদের বঙ্গীয় ভাবধারার কবিতা বলে মানতে পারি না। তবে অখণ্ড বাংলার কবিতার পর স্বাধীন বাংলাদেশের কবিতা যাত্রাটা কিন্তু ভিন্ন। তাই আমি ঐসব কবিতা আন্দোলনের বাঁক বদলের সঙ্গে আমাদের দেশের কবিতার বাঁক বদলের সঙ্গে মিলাতে চাই না। আমি তো মনে করি এসব আন্দোলন আমাদের অখণ্ড বাংলার মূল কবিতা থেকেও অনেকটা বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে! স্বীকার করতে হয় তাদের কবিতায় উচ্ছৃঙ্খলার একটা চমক ছিল, কিন্তু তা সার্বজনীন হতে পারেনি!

এই সময়ের তরুণ-তরুণি কবিরা প্রত্যেকে প্রত্যেককে আড়ালে বোকাচোদা সম্বোধন করে কেন?

এটা সব সময়ই ছিল বলে মনে করি। এসবে পাত্তা দেওয়ার কিছু নাই। এটা স্রেফ নোংরামী ছাড়া কিছু না। ভাবারও কিছু নাই।

এই সময়ের কাদের লেখা ভাবায়- মুগ্ধ করে?

যারা বেঁচে আছেন এই সময়ে তাদের ভেতর মোহাম্মদ রফিক, খালেদ হোসাইন, ময়ূখ চৌধুরী, গৌরাঙ্গ মোহান্ত, আবু হাসান শাহরিয়ার, রহমান হেনরী, জুয়েল মাজহার, ফরিদ কবির, মাসরুর আরেফীন, সাজ্জাদ শরীফ, কাজল শাহনেওয়াজ, আহমদ নকীব, কফিল আহমেদ, রথো রাফি, ফিরোজ এহতেশাম, ফারহান ইশরাক, সঞ্জীব পুরোহীত, হাসনাত শোয়েব, মমিন মানব, জিয়াবুল ইবন, বিজয় আহমেদ, টোকন ঠাকুর, আলফ্রেড খোকন, মারজুক রাসেল, আলতাফ শাহনেওয়াজ, রাদ আহমদসহ আরো কজনের কবিতা আমাকে মুগ্ধ করে এবং ভাবায়।

লেখকের স্বাধীনতা বলতে আপনি কী মনে করেন?

লেখকের স্বাধীনতার পূর্বে আমি লেখকের উচ্চতর শিক্ষার প্রসঙ্গ তুলতে চাই। লেখকের কথা বোঝার জন্যও জাতিকে যথাযথ শিক্ষিয় শিক্ষিত হতে হবে। রাষ্ট্র ব্যবস্থায় শিক্ষার উৎকর্ষতার পূর্বে লেখকের স্বাধীনতা প্রশ্নটাও যথাযথ ফলপ্রসু নয়। আমি কিন্তু লেখকের স্বাধীনতার বিপক্ষে বলছি না। স্বাধীনতার পক্ষেই বলছি। একজন লেখক তার রাষ্ট্র, সমাজ ও যাপনের দর্শন নিয়ে যা বলতে চান, তাকে কিন্তু তা বলতে দেওয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নৈতিকতার ভেতর পরে বলে মনে করি। কিন্তু যে দেশে যথাযথ রাজনৈতিক, সামাজিক, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও বিজ্ঞানমনস্কতা সর্বপোরি শিক্ষার ঘাটতি থাকে, সেখানে লেখকের স্বাধীনতা হীতে বিপরীত ঘটায়। যেমন আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থাকেই ধরেন। এখানে কিন্তু সেই অর্থে তেমন লেখক শ্রেণির উত্থান ঘটেনি। যা ঘটেছে তাতে দলদাস, সাম্প্রদায়িক স্বার্থন্বেষি প্রতিক্রিয়াশীলের উদ্ভব ঘটেছে। যারা বিভক্ত তৈরি করে যাচ্ছে। এখন এই শ্রেণির সমাজ ও রাষ্ট্রের লেখকের স্বাধীনতা কতটুকু কার্যকর? মানবিক রাষ্ট্র কায়েম না হলে কিন্তু তা অর্থহীন। সাম্প্রদায়িকতার আঘাতে হুমায়ূন আজাদের মতো অনেক লেখকেই বলি হতে হবে। অপরদিকে ভূঁইফোর লেখক সম্প্রদায়রা নবীদের পর্যায় পৌঁছে যাবে। এক্ষেত্রে আমি কিছুটা সেন্সরশিপের পক্ষে। তবে শর্ত থাকবে বিজ্ঞানবাদীতা, মুক্তবুদ্ধির চর্চাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে।

একজন কবি ও দার্শনিকের মধ্যে পার্থক্যটা কোথায়?

একজন কবি ও দার্শনিকের ভেতর পার্থক্য রয়েছেই। তবে দুজনকে আমি সময়ের দ্রষ্টা হিসেবে ভাবতে চাই। কথা থাকে, কবি শুধু তার সময়কে লিপিবদ্ধ করে যান আর দার্শনিক ঘটনার কার্যকারণকেও নির্দেশ করেন। কবি তা করেন না। কবির কাজও নয় সেটা। কিন্তু দার্শনিকের কাজ জগৎ ও জীবনের স্বরূপ আলোচনা করা।

সাহিত্যের বিশ্বাস আর ধর্মের বিশ্বাসের মধ্যে পার্থক্য বা দ্বন্দ্ব কোথায়?

সাহিত্য সমাজের দর্পণ, এটা একদম সেকাল থেকেই বলা হয়। মানুষের জীবন যাপন ও সভ্যতার সঙ্গে যা কিছু রিলেটেড তার সব কিছু নিয়েই সাহিত্য রচিত হয়। এক্ষেত্রে সাহিত্যের কোনো বিশ্বাস নেই। এটা প্রশ্ন করাটাও অবান্তর বলে মনে করি। সাহিত্য ও ধর্ম এক নয়। ধর্ম সাহিত্য রচনার একটি উপাদান কিন্ত সাহিত্য ধর্মের কিছু না। ধর্মের বিভিন্ন বিষয় সাহিত্যের বিভিন্ন মাধ্যমে উঠে আসতে পারে কিন্তু ধর্মে সাহিত্যের কিছু নির্মিত হতে পারে না। ধর্ম ধর্মীয় সাহিত্য রচনার নির্দেশ দিতে পারে মাত্র। সেই নির্দেশিত সাহিত্য পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে ওঠে। ধর্মের বিশ্বাস বিশ্বাসই। এর সত্যতা প্রশ্নবিদ্ধ ও মানুষের সম্প্রীতির বন্ধনের পক্ষে সহায়ক নয়। সেখানে সুসাহিত্য মানুষে মানুষে সম্প্রীতির চিন্তাকে উস্কে দিতে পারে। মানবিকতাকে জাগ্রত করতে পারে। একজন সৎ সাহিত্যিক বা লেখকের সাহিত্য বিভেদের পক্ষে হতে পারে না। সেখানে ধর্ম বরাবরই পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে বিভেদ সৃষ্টি করে। সাহিত্য ধর্মের উদ্ভবের পূর্ব থেকেই বিদ্যমান। ধর্ম সাহিত্যকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। এখানে দ্বন্দ সৃষ্টিরও বিষয় আমি দেখি না। কেউ হয়তো সাহিত্যে ধর্মের সমালোচনা আর ধর্মে সাহিত্যের সমালোচনা বলে উল্লেখ করতে পারেন। এটাকেও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। তবে এটা মানতে হবে ধর্ম যেভাবে পক্ষপাতদুষ্ট সাহিত্য কিন্ত তা না। এরূপ সাম্প্রদায়িক সাহিত্য বেশি দিন বাঁচেও না।

Leave a Reply

%d bloggers like this: