মধ্যবিত্ত আজ পুঁজিবাদের শিকার

রোজিনা রাখী

বিশেষ দিনগুলোকে পুঁজি করে নিজের আখের গোছাচ্ছি নাতো ? কেন বললাম জানেন ? সেদিন আমি দেশের অনেক পুরোনো একটা দেশি ব্র্যান্ডের কাপড়ের দোকানে গিয়েছিলাম, যেখানে আমাদের দেশের বিশেষ মডেলরা কেনাকাটা  করেন । গিয়েছিলাম কেনাকটা করতে নয় ,ব্যাংকের কাজে সময় লাগবে বলে ওখানে কিছুক্ষন হাঁটাহাঁটি করে সময় পাড় করতে। আমার চক্ষু চড়ক গাছ । এই করোনার মহামারিতেও তারা বানিয়ে রেখেছেন নানান রং  আর ঢং এর মাস্ক ।এর এক একটার দাম ভ্যাটসহ প্রায় ২০০থেকে ৩০০ টাকা।( যে টাকায় ভালো মানের কয়েক কেজি চাল কেনা যায় ) এটাই ছিলো ওখানে সর্বোচ্চ কম দামী পন্য । একুশ  কে সামনে রেখে তারা বিভিন্ন ডিজাইনের জামা কুর্তাও রেখেছেন ।যার দাম সর্বনিম্ন ১২০০ টাকা ভ্যাট সহ ১৩০০ প্লাস (তার সাথে ওড়না এবং সালোয়ার নেই ,ওটা কিনতে কত টাকা লাগবে হিসেব করে বের করুন) । আর শাড়ির কথা বলাই বাহুল্য । যেটাই পছন্দ হয় তার গায়েই লেখা ২৫০০ প্লাস ভ্যাট ।এবার গেলাম গয়নার কাছে ,ওমা মেয়েটা বলল ,আপু এটার দাম সাড়ে ৫০০ টাকা পড়বে । আমি বললাম, এসব ঝুলানো জিনিস আমি পড়ি না।এবার দেখলাম বাহাড়ি ডিজাইনের মগ।যেটা একটু ভালো লাগলো হাত দিয়ে দেখি ভ্যাটসহ ৩৫০ টাকা মাত্র।

এসব দোকানে গেলেই ওনারা ভাবেন আমরা গাড়ি নিয়ে এসছি আর সব পেমেন্ট হবে কার্ড এ ।মান সম্মান নিয়ে ওখান থেকে বের হয়ে আসাটাই দ্বায় ।যাই হোক কোনো রকমে পাশ কাটিয়ে গেলাম সেল চলছে এমন দোকানে ।সেল দেবার পর যেটা আসছে তার দাম আমার এক মাসের বাসা ভাড়ার অর্ধেক । আপনারা হয়তো বলবেন ,কি দরকার আমার মতো ছা – পোষা মানুষের আভিজাতিক দোকানে যাবার ? পাশে তো ঢাকা কলেজের অপজিট আছেই ! হ্যা আপনাদের এমন কথার অবশ্যই যুক্তি আছে ।কিন্তু আমরা কি সবাই ঢাকা কলেজের অপজিট খুঁজি ? কেউ কেউ তো বছরে শখ করে হলেও একটা দামী জিনিস কিনতে যাই তাই না ?

কি ভয়াবহ শীত এবার -সারা বাংলাদেশের মানুষ পোহালো তা অকল্পনীয়।যারা রাস্তায় ছিলেন কিম্বা যাদের একটা কম্বল বা লেপও ছিলো না তাদের জন্য কিসের ভালোবাসা কিসের ফাল্গুন আর কিসের একুশ ।একুশ আমাদের চেতনার মাস ভাষার মাস ।এই দিবসকে  সামনে রেখে আগে আমরা কত আয়োজন করতাম।শহীদ মিনারে ফুল দিতে হবে ।খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতে হবে ।রাতের আঁধারে এর বাড়ি ওর বাড়ি থেকে দেয়াল টপকে গাঁদাফুল গোলাম ফুল চুরি করে এনে ঘরে লুকিয়ে রাখতাম ।খুঁজে খুঁজে পুরোনো কোনো কালো বা সাদা জামা মাথার কাছে নিয়ে ঘুমাতাম।আর এখন ? সাদা কালো মগ কিনি ২১শের উপহার হিসেবে ,যার দাম মধ্যবিত্তের নাগালের অনেকটা বাইরে।এক একটা সাদাকালো শাড়ির দাম ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা। এটাই কি তবে চেতনা ?

সময় বদলে গেছে ।মানুষ আধুনিক হয়েছে ।যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলাই নাকি আধুনিকতা ! সব সময় সব ক্ষেত্রে এটা বোধহয় ঠিক কথা নয় ।আসলে সময় বদলে যায়নি ।বদলে গেছি আমরা ,বদলে গেছে কিছু সদ্য টাকা হওয়া মানুষের রুচি আর পুঁজিবাদ নামক ব্যবসায়ীদের ফায়দা লোটার কায়দা।এইসব পুঁজিবাদরা খুঁজে খুঁজে এক একটা দিন ক্ষন বের করেন ,তারপর সেটাকে বিক্রি করেন বোকা বাঙালির কাছে।কত দিবস আজকাল বেড়িয়েছে তার নাম গুনে শেষ করা যাবে না ।

হলুদ জামা হলুদ শাড়ি কি পড়তেই হবে ফাল্গুনে ।যে মেয়েটার একটা ভালো জামা নেই কিম্বা কোনো রকমে দুটো শাড়ি দিয়ে পার করছে দিন তার মনের অবস্থা কি আমরা আধুনিকরা ভাবি ? হলুদ জামা হলুদ শাড়ি পড়ে টিএসসিতে হাঁটলেই কি ফাগুন সার্থক অথবা লাল শাড়ি পড়ে প্রেমিকের হাত ধরে এখান সেখান রিকশায় ঘুরলেই সেটা প্রেম আর যে ছেলেটা সদ্য চাকরি হারিয়ে পথে পথে ঘুরছে ,বাড়িতে মা বাবা ভাই বোনের জন্য দুটো টাকা পাঠাতে পারছে না তার প্রেমিকা কি লাল শাড়ি বিহনে ছেড়ে যাবে সেই বেকার প্রেমিককে ? জানিনা আসলে কোনটা ফাগুন আর কোনটা প্রেম ? সব কেমন গুলিয়ে যায় এই মধ্যবিত্তের না পাওয়া জীবনে ।হয়ত বলতেই পারেন যাদের টাকা আছে তারা কি আনন্দ করবে না ,ঘুরবে না ,বেড়াবে না ? নিশ্চয়ই ! তবে তার আগে একটু ভেবে দেখুন, এইসব দিবস কোথা থেকে এলো ,এইসব দিবসকে সামনে রেখে কারা লাভবান হচ্ছেন ? আজকাল তো আমাদের এক শ্রেণীর মানুষের মাথায় পোকা ঢুকেই গেছে ঈদ পুজো পার্বণ মানেই সেটা পালন করতে হবে থাইল্যান্ড –ব্যাংকক কিম্বা মালেয়শিয়া ।নইলে অফিস কলিগ আর বড়লোক আত্মীয় স্বজনের কাছে মান থাকবে না।

বাংলাদেশে এখন অসংখ্য নামী দামী  কাপড়ের ব্র্যান্ড ।কই তাদের কোনো মালিককেই তো দেখলাম না মাত্র ক’দিন আগে শহীদ মিনারে ধর্ষিত হওয়া ছোট্র মীমের জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে দুটো নীতিবাক্য ঝাড়তে ? তারা এখন ব্যস্ত কারণ সামনে তাদের ব্যবসার মৌসুম । গত লেখায় তাই বলেছিলাম এরকম দু চারটে মীম ধর্ষিত হয়ে মারা গেলে শহীদ মিনারে পরে থাকলে কারো কিস্যু যাবে আসবে না।কারন আমরা ভুলে যাওয়া জাতি ।কিছুই মনে রাখি না বা রাখতে চাই না।

আমি বলছি না এসব আনন্দ উল্লাস থেমে থাক ।বসন্ত –ভালবাসা এসব দিবস বন্ধ হয়ে যাক ।আমি চাই আমরা ছোট বড় সবাই সব শ্রেণী পেশার মানুষ যেন একটা সমতা বন্টন করতে পারি ।ফায়দা লুটতে না পারে ঐ সব পুঁজিবাদরা । দেশ এক ভয়াবহ পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছে ।কত মানুষ কর্মহীন কত মানুষের ঘরে বাজার নেই চাল নেই তা কি আমি আপনি খোঁজ নিয়ে জানতে পারছি ।কত মানুষ করোনায় এই প্রিয় শহর ছেড়ে চলে গেছেন গ্রামে ।কি করে কাটছে তাদের দিন সেসব কি আমরা ভাবি ? কিছু মানুষ থাকেন যারা দুঃখ টাকে আড়াল করেও হাসতে জানেন ।আমরা এই হতভাগা মধ্যবিত্ত সমাজ সেই মেকি হাসির দলে আটকে যাওয়া মানুষ ।আসলে সমাজ বদলাইনি, দেশও বদলায়নি বদলে গেছে কিছু কিছু মানুষের আদিখ্যেতা মেশানো রুচিবোধ।

আমরা ভুলে গেছি আমাদের নিজেদের ঐতিহ্য –রীতি সামাজিকতা সেই সাথে ভুলে গেছি মানবিকতা।সব থাক -প্রেম ভালবাসা বসন্ত শুধু ভুলে যাই বাণিজ্য নামক পুঁজিবাদকে । দেশটাকে ভালবাসি ,নিজের স্বার্থে দেশের মানুষগুলোকে ব্যবহার না করি ।

Leave a Reply