মানুষ হোক মানবিক

রোজিনা রাখী

গ্রামে অনেক আগে লজিং মানে জায়গির থাকতো।আমাদের বাড়িতে দু’একজন জায়গির ছিলেন  । সেসব জায়গিরদের আবার থাকা খাওয়া বাবদ কোনো খরচ দিতে হতো না। কারণ যারা একটু অর্থনৈতিক ভাব স্বচ্ছল এবং মানবিক তাদের বাড়িতেই সাধারনত জায়গির রাখা হতো ।খুব বেশি হলে সেসব জায়গিররা তাদের পড়ালেখার বা কাজের অবসরে বাড়ির ছোট ছোট বাচ্চাদের একটু লেখাপড়া শেখাতেন।তো আমাদের বাড়িতে প্রথম দিকে যিনি ছিলেন তাঁর নাম আমার বাবা নামের নাম হওয়াতে বাবা তাঁকে আপনি করে মিতা বলেই  সম্মোধন করতেন। সেই জায়গির চাচার মা আমার বাবা কে বানালেন বড় ছেলে এবং সম্পর্ক হলো খুব পারিবারিক।যার স্থায়িত্ব ছিল দীর্ঘ বছর ।তবে এ সব কিছুই আমার জন্মের আগের কাহিনী।

জায়গির চাচা এক সময় বিসিএস ক্যাডার হলেন । বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের ডেপুটি ডিরেক্ট্রর ও হলেন।আমার অনার্স ভর্তি পরীক্ষার সময় সেই চাচার বাসায় এসে উঠলাম।খুব ধনী ঘরের আদুরে এক মেয়েকে বিয়ে করেছেন  চাচা।গ্রামের কিছু অতি শিক্ষিত ছেলেরা যা করেন আর কি,উনিও তার ব্যতিক্রম করেননি।যাই হোক প্রথম দিন ঐ চাচি আমাকে খুব আদর করলেন ,নিজ হাতে চুল ও বেঁধে দিলেন ,খাবার প্লেট টাও ধুতে দিলেন না।কিন্তু তিন দিনের মাথায় আমার বোনকে বললেন ,তোমাদের যেহেতু ঢাকায় আপন কেউ নেই তাহলে রাখীকে কেন ঢাকায় ভর্তি করবে ?  

কথায় বলে না ,বুদ্ধিমানের জন্য ইশারাই যথেস্ট ।পরের দিন আমরা ব্যাগ পোটলা নিয়ে আমার চাচাতো বোনের বাড়ি চলে গেলাম।দুলাভাই মন্ত্রনালয়ে চাকরি করলেও খুব সৎ ছিলেন ।দুই রুমের ঘরে খুব সাধারণ জীবণ যাপন করতেন।আমাকে রোজ সকালে কলেজে নামিয়ে দিয়ে অফিস যেতেন আবার দুপুরে আমার ভাগনা এসে লালামাটিয়া মহিলা কলেজ থেকে আমাকে নিয়ে যেত।যতদিন হোস্টেলে সিট পেলাম না তত দিন ওদের বাসায়ই থাকলাম। দুলাভাই বুবু ভাগ্নারা কোনোদিন আমার সাথে খারাপ ব্যবহার তো  করেইনি বরং বাড়ির জন্য কান্নাকাটি করলে আর ও বোঝাতো।

 তারপর থেকে সেই চাচার বাসায় আমরা আর কোনো দিন যাইনি।যদিও চাচা চাচি গিয়েছেন আমাদের বাড়িতে।এরপর  আমার পড়ালেখার পাঠ চুকে গেলো।আব্বা একদিন চাচাকে বললেন ,ভাই আপনি তো একটা ভালো জায়গায় চাকরি করেন আমার মেয়েটার জন্য একটা ছেলে দেখে দেন ।আমার সেই  চাচা আব্বাকে জবাব দিলেন ,আপনার কি ঢাকায় ফ্ল্যাট আছে ?আজকাল ছেলেরা বিয়ের আগে মেয়ের চেয়ে মেয়ের বাড়ি গাড়ি কে বেশি প্রাধান্য দেয়।(আব্বা তখন হোঁচট খেলেও এখন বুঝি ঘটনা অতি সত্য)।

এরপর কি হলো ,আব্বা তো আমাদের ছেড়ে চলেই গেলেন ।যেদিন আব্বার চল্লিশা মানে মৃত্যুর ৪০ দিনে যে মিলাদ হয় সেদিন হঠাৎ এক বড় ভাই আমাদের বাড়ি এসে হাজির।আমার ভাই বোনদের বললেন,রাখীকে একটু দেখতে আসতে চায় এক ভদ্রলোক উনার ছেলের জন্য। আমার বাড়ির লোকেরা তো কিছুতেই রাজি না ।বলল না আজ আমাদের জন্য খুব শোকার্ত একটা দিন আর রাখী আব্বার সবচেয়ে প্রিয় কাজেই কোনো ভাবেই সম্ভব না।কিন্তু ওই ভাই নাছোড় বান্দা ।বলে -দেখেন ,চাচামিয়া তো ফিরে আসবে না কিন্তু রাখীর তো বিয়ে দিতে হবে।উনারা গাড়ি নিয়ে রাস্তায় অপেক্ষা করছে ।প্লিজ ৫মিনিটের জন্য আসতে দেন,নাস্তাও দিতে হবেনা।

ভদ্রলোক এবং ভদ্রমহিলা দারুণ স্মার্ট এবং পরিমিত ভাষায় কথা বললেন ।আমাকে খুব সহমর্মিতা দেখালেন।ভদ্রলোক সাবেক সচিব ।উনার ছেলে ও একটা ভালো পদে আছেন ।উনারা চলে যাবার পর আমার ভাই সেই পরিচিত ভাইকে জিজ্ঞেস করলেন ,ঢাকায় উনাদের বাড়ি গাড়ি হাই স্ট্যাটাস তাহলে আমাদের মতো মধ্যবিত্ত বাড়ির মেয়েকে চায় কেন? জানা গেলো উনারা এলাকার মেয়ে ছাড়া বাইরে ছেলে বিয়ে করাবেন না।যাই হোক আমাকে পছন্দ হলো আমার পরিবার পছন্দ হলো কিন্তু বিয়েটা আটকে গেলো , আমার বাবার ঢাকায় ফ্ল্যাট নেই বলে।কি মুশকিল হলো বলুন তো ? আমার চৌদ্দ গোষ্ঠী থাকে গ্রামে ,করে খায় সাধারণ ব্যবসা বানিজ্য ,তারা ঢাকায় ফ্ল্যাট দিয়ে কি করবে ?যারা আমরা এই শহরে পড়ালেখা করতে এসেছি তারা যদি পারি তো চাকরি বাকরি  করে  ফ্ল্যাট কিনবো নইলে নাই । তবে  কেন সবাই ফ্ল্যাট খোঁজেন এর উত্তর গাইড বই  ঘেটে  খুঁজতে হয়নি ।আপনা আপনিই পেয়ে গিয়েছি জবাব ।কারণ আমার এলাকায় যত মধ্যবিত্ত ঘরের উচ্চ শিক্ষিত ছেলেরা বিয়ে করেছে তারা কেউ ফ্ল্যাট বা গাড়িওয়ালার মেয়ে ছাড়া বিয়ে করেনি ।তার মানে নিজেকে বিক্রি করতে এরা শিক্ষিত করেছে নিজেকে। আর টাকাওয়ালা বাবারাও বুঝে গিয়েছেন, শিক্ষিত উঁচু পদের চাকুরে পাত্র ধরতে গেলে মেয়ে অশিক্ষিত হলেও সমস্যা নাই কারণ ছেলেরা বিয়ের ক্ষেত্রে কম বয়সি মেয়ে আর টাকার হিসেব (ক্যালকুলেশন ) খুব ভালো বোঝে।

এবার মূল প্রসঙ্গে আসি ।কেন ঢাকা শহরে ফ্ল্যাট এত জরুরী সেটা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। করোনায় আমার বাড়িওয়ালা ভাই আমাকে খুব সহযোগিতা করেছেন।বেশ কয়েকমাস বলতে গেলে নামে মাত্র ভাড়ায় সেখানে থেকেছি।কিন্তু এভাবে কতদিন ।তাই অফিস পাড়ায় চলে এলাম।সেই সময় একটা এক রুমের বাসা খুঁজতে আমার এবং আমার অফিসের কলিগ থেকে শুরু করে স্টাফদের যে কি পরিমান পেরেশান হতে হয়েছে তা অকল্পনীয়। শুনেছিলাম করোনায় নাকি পানির দরে বাসা ভাড়া চলছে ।কারণ ঢাকা শহরের অর্ধেক মানুষ কর্মহীন হয়ে এ শহর ছেড়ে গ্রামে চলে গিয়েছে।কিন্তু মাঠে নেমে বাসা খুঁজতে গিয়ে দেখলাম সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র ।বরং বাড়িওয়ালাদের চাহিদা দ্বিগুন বেড়ে গিয়েছে। উনারা সুযোগে সৎ ব্যবহার করছেন।প্রতিটি সাবলেট এর ভাড়া ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা ,পানি –বিদ্যুৎ গ্যাস এসব ছাড়াই।এমনিতেই করোনায় হাফ বেতন পাচ্ছেন দেশের অধিকাংশ বেসরকারি কর্মকর্তা – কর্মচারি তারপরও ঢাকার বাড়িওয়ালারা করছেন ডাকাতি ।

এবার সম্প্রতি ঘটে যাওয়া আমার নিজের বাসার গল্প বলি। অনুগ্রহ করে একটু মানবিকভাবে ভাবুন গল্পের সারমর্মটা।  

ঢাকা শহরে আমার অনেক আত্মীয়ই আছেন তাদের অধিকাংশই বেশ দূরে দূরে থাকেন।আমার ভাইয়ের মেয়েটা খুব অসুস্থ ।ওর বাবা মা ওকে নিয়ে আমার বাসায় এলো ডাক্তার দেখাতে ।আমি একা একটা রুম নিয়ে থাকি এমনকি ওয়াশরুমও এটাচ।যেন কাউকে বাইরে যেয়ে পাশের রুমে থাকা মেয়েদের বিরক্ত করতে না হয়।যাই হোক বাড়িওয়ালার স্ত্রী আগেই বলেছিলেন ,আমার বাবা মাকে আসতে ।কারণ মেয়ে যেহেতু একা থাকবে কাজেই বাবা মার আসা উচিত।আমার তো বাবা নেই ।আর মা ঢাকা শহর পছন্দই করেন না ।কাজেই মাঝে মধ্যে এলে বোনেরাই আসেন ডাক্তার দেখাতে তাদের হাজবেন্ডের সাথে।আমি আগে ছিলাম রীতিমতো একটা শিক্ষিত পাড়ায় এবং বাড়িওয়ালা ভাই ভাবী ছিলেন অসম্ভব মানবিক।এমনকি আমি যেদিন নতুন বাসায় এলাম সেই রাতেই বাড়িওয়ালা ভাই ,ওনার ছেলে এবং এক পড়শিসহ আমাকে দেখে গেলেন ।আমি কোথায় বাসা নিয়েছি কেমন সিকিয়রিটি।

যাই হোক  নিয়ম অনুযায়ী আমি নতুন বাড়িওয়ালাকে ফোন দিলাম ।বিনয়ের সাথে বললাম,আংকেল আমার ভাইয়ের মেয়েটা খুব অসুস্থ ,আগামীকাল আমার ভাই ভাবি মেয়েটাকে নিয়ে আমার বাসায় আসবে এবং এক রাত থেকে ডাক্তার  দেখিয়ে চলে যাবে।উনি রাজি হলেন।কিন্তু কপাল খারাপ হলে যা হয় ।রিপোর্ট টা ভালো এলোনা।ওদের আরো ক’দিন থাকতে হলো। সারাদিন আমরা হাসপাতালে দৌঁড়াই, রাত ৯/১০ টার দিকে আমার ভাই মিরপুরে এক আত্মীয়ের বাসায় ঘুমাতে যায় আবার সকালে মেয়ের কাছে চলে  আসে এবং আবার ডাক্তারের কাছে দৌঁড়ায় ।ইতিমধ্যে পাশের রুমের শিক্ষিত মানবিক মেয়েরা বাড়িওয়ালা কে বলেছেন আমার বাসার অতিথির জন্য তাদের নাকি ব্যাপক অসুবিধা হচ্ছে এমনকি তারা ভদ্রতা করেও আমার ভাইয়ের মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করেনি ,তুমি কেমন আছো?আর তাদের অসুবিধা হবে বলে আমি  আমার রুমের দরোজা লাগিয়েই রাখি ।আসলে যারা এমন কঠিন বিপদে না পড়ে তারা বুঝবে না ।তাদের কাছে বিষয়টা খুব  সাধারণ মনে হবে। অথচ আমি আমার বাড়ির মানুষের গ্রামের মানুষের পরিচিতজনের একটু  থাকার সুবিধার জন্য নিজের বেতনের প্রায় সবটুকু টাকা দিয়ে একা একটা রুম নিয়েছি ।কারণ আমি জানি এই ইট কাঠের শহরে আপনজন না থাকার কি যন্ত্রনা ।আর আমার কাছে সবাই আসে এবং স্বচ্ছন্দ বোধ করে ,কেন জানিনা।একজন মানুষ হিসেবে এটা একটা মানবিক কাজ বলে আমি মনে করি।বিপদে যদি কারো পাশেই না দাঁড়াতে পারি তাহলে এই শহরে থাকার তো কোনো দরকার নেই।

সেদিক থেকে বলবো ,ছেলেরাই ভালো ।মাসের পর মাস ওদের কাছে বন্ধুরা এসে ফ্রি থাকে খায় ।এজন্যই আমি সেদিন লিখেছিলাম আমি মেয়েদের পছন্দ করি না ,সেইসব মেয়েদের যারা কেবল পাতা মুখস্ত করে কয়েকটা সার্টিফিকেট অর্জন করে কিন্তু মানবিক হতে পারে না।আরও লিখেছিলাম প্রেম করলে কেউ ওতোটা সাধুও থাকে না।প্রেম করবো আর হাত ধরবো না ,কিস করবো না এটা কেমন কথা তাহলে তাদের শারীরিক সমস্যা আছে ডাক্তার দেখানো উচিত ।কথাটা লেখার কারণ ,আমার পাশের শিক্ষিত নামক দুই নারী রোজ সন্ধ্যাসাঁঝে সেজেগুজে ডেটিং এ যান ।অথচ আমার বাসায় একজন বাবাসম ভাই এলে প্রবলেম,স্থানীয় অভিভাবক আমার  খোঁজ নিতে এলে সমস্যা ,বয়ফ্রেন্ড তো বাদ ই দিলাম।

কিন্তু তারা যখন এই বাসায় উঠেন তখন রাত প্রায় ১১টা অব্দি একটা ছেলে থেকে সব কিছু গুছিয়ে দিয়ে যায়।বলা হয় সে নাকি দাদা হয়।পরে জানা গেল সম্পর্কে দাদা হলেও সে মেয়েটির প্রেমিক।যাই হোক ,আমার বাসার অসুস্থ অতিথি নিয়ে বাড়িওয়ালাকে আজেবাজে কথা জানানো হলে বাড়িওয়ালা আমাকে ফোন করেন এবং বলেন এটা হাসপাতাল নয়, তুমি একদিনের কথা বলে এতদিন গেস্ট রাখছো কেন?আমার পানি খরচ হচ্ছে আরো হাবিজাবি বললেন সেই সাথে এটাও বললেন তোমরা হোটেলে থাকো ,আগামী মাসে বাসা ছেড়ে দাও।আমি কান পেতে শুনলাম।হজমও করলাম কারণ আমি তো বিপদে আছি কাজেই চুপ থাকা ছাড়া উপায় কি?

পরের দিন সকালে আমার ভাই ভাবী মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেন।আমি রাতে বাড়িওয়ালাকে ফোন দিয়ে বললাম ,আঙ্কেল পানি নেই পানি ছাড়েন।উনি বললেন,তুমি পানির বিল দিয়ে যাও।বললাম বাড়িভাড়ার সাথে দিয়ে দিব এক্সটা টাকা।উনি রাজি হলেন না।আমি তখনি এক হাজার টাকা দিয়ে এলাম আর বললাম গুনে নিতে।ইতিমধ্যে পাশের রুমের ওই মেয়ে দুটো যে যার মতো বাসায় চলে গেছে।আমি পুরো বাসায় একা প্রায় তিন চার দিন।হাসপাতাল বাসা অফিস জীবণ পুরো তেজপাতা।পরের দিন অফিস থেকে যথারীতি বাসায় গেলাম ।ভাবলাম বাসায় যেয়ে  রোগীর জন্য রান্না করে হাসপাতালে যাবো ।সিঁড়ি থেকেই দরোজায় তাকিয়ে দেখি তালা নেই ।মনে মনে খুশী হলাম ,যাক বাবা ব্যাগ থেকে চাবি বের করে তালা খুলে আর ঘরে ঢুকতে হবে না।মেয়েরা এসে গেছে।কিন্তু দরোজার কাছে গিয়ে আমি অবাক।তালা ভাঙা ,লক ভাঙা ,দরোজা হালকা ২/৩ ইঞ্চি ফাঁক ।আমি উঁকি দিয়ে দেখি করিডরে আলো জ্বলছে ।যে মেয়েটা সব সময় বাসায় থাকে ওর নাম ধরে ডাকলাম ,নাহ কোনো সাড়া শব্দ পেলাম না।সাহস করে দরোজা পুরোটা সরিয়ে দাঁড়ালাম ।দেখি ওদের রুমের দরোজা খোলা। নিশ্চিত হলাম মেয়েটা আসছে কারণ ওরা দুজন নীচে হাঁটতে গেলেও ঘরে তালা লাগিয়ে যায় কিন্তু আমি হিল্লি দিল্লি গেলেও ঘর খোলা রেখে যাই।আবার ডাকলাম ,এবারও সাড়া পেলাম না ।ভাবলাম ওয়াশ রুমে , তাকিয়ে দেখি ওয়াশ রুমে বাইরে থেকে ছিটকিনি দেয়া।এবার আমার রুমের দিকে তাকিয়ে আমি হতভম্ব।ঘরের ভেতর সব এলোমেলো ভাবে ছড়ানো ছিটানো।ভেতরে ঢুকতে সাহস পেলাম না।বাইরে এসে বাড়িওয়ালা কে ফোন দিয়ে জানালাম।উনি বললেন,উনি আসতে পারবেন না অসুস্থ।বললাম আন্টি অথবা আপনার ছেলে মেয়েকে পাঠান।দেখে যাক কি ভয়ঙ্কর অবস্থা।উনি বললেন,এত বছরে এসব হয়নি আজ কেন হবে? তোমার আত্মীয়স্বজন এসব করেছে।আমি ফোন কেটে আমার ভাইকে ফোন দিলাম।ও বলল,একা ঘরে ঢুকবি না,কেউ আসুক তারপর ঘরে ঢুকবি।ভাগ্যিস আমার বড় বোন তখন ঢাকায় ।ওকে ফোন দিয়ে বললাম এখনি বাসায় আয়।ও বলে নামাজটা পড়ে আসি ।আরেহ রাখ তোর নামায আমি ঘরে ঢুকতে পারছি না ।তাড়িতাড়ি আয় আমার ভয় লাগছে। প্রায় আধা ঘন্টা পর বাড়িওয়ালি এসে ঘুরে দেখে আবোল তাবোল বলে চলে গেলেন।অন্য মেয়েরা কই –কেন বাসায় গিয়েছে এসব ।

আমার বড় বোন ঢাকার তেমন কিছুই চিনে না।তবু ও ফেরেস্তার মতো এসে হাজির ।ওর সাথে ঘরে ঢুকলাম।এর মধ্যে বাকি দু’জন মেয়েকে সব তো আগেই জানিয়েছি ।ভিডিও কলে দেখিয়েছি ।আশ্চর্য ব্যাপার ওদের রুম যেমন গোছানো তেমনই ছিলো। একটা মেয়ে ঢাকাতেই ছিল ।সে নাকি গুলশান ছিল ।কিন্তু গুলশান থেকে এত অল্প সময়ে আসা যায় কেমনে হেলিপ্যাড ছাড়া আমি জানিনা।সে আসবার সময় একটা তালা কিনে এনেছিল ।এসে নিজের সব গুছিয়ে ট্রলি টা নিয়ে চলে গেল এবং নিরুত্তাপ ।আমি লক সাড়ালাম ।অন্য যে মেয়েটা ঢাকার বাইরে সেও তার বোনকে পাঠালো এসে ল্যাপটপ টা নিয়ে চলে গেলো।ইতিমধ্যে বাড়িওয়ালার ছেলেমেয়ে আসলেন।তারা উল্টা আমাকেই ব্লেম করলেন ।আমার অতিথি বেশি আসে এজন্য মেয়েরা  কমপ্লেন করেছে।সবচেয়ে মজার বিষয় কিছুই চুরি হয়নি।টাকা ,গহনা কম্পিউটার কিছুই না।শুধু তছনছ ।বলে রাখা ভালো এ বাসায় কোনো দারোয়ান নেই ।তবে বাসায় যদি একটা ছোট্র লোহাও পোতা হয় তাহলেও বাড়িওয়ালা এক মিনিটের মধ্যে ফোন দেন।আমি তখন ওনার মেয়েকে বললাম ,এতগুলো তালা -লক ভাঙা হলো আর আংকেল টের পেলেন না? তখন ভদ্রমহিলা অগ্নিমূর্তি ধারণ করলেন ,খুব আঁতে লাগলো, আমার উপর ভীষণ খেপলেন ।উনার বাবা নাকি ৯৯৯ এ ফোন দিয়েছিলেন কিন্তু উনারা বলেছেন ,কোনো কিছু খোয়া না গেলে আমরা স্পটে যাইনা।এদিকে আমার ভাই মেয়েকে রেখে আসতে পারছে না বলে একটু পর পর ফোন দিচ্ছে আর বলছে ,তুই কি ভয় পেয়েছিস?যদিও পেয়েছিলাম কিন্তু স্বীকার করিনি ওরা চিন্তা করবে বলে।

ইতিমধ্যে আমার অফিসের ছেলেগুলো ,কলিগস আমার ভাগ্নি-ভাগ্না সবাই এলো।আমার কিছু প্রশাসনিক উচ্চ পদস্থ আত্মীয় স্বজন ফোন দিতে লাগল এবং আসতেও চাইলো।আমি বারন করলাম ।কারন আমার ভাইয়ের মেয়েটার দু’দিন পর অপারেশন ।আমি ঐ মুহূর্তে আর ঝামেলা বাড়াতে চাইলাম না।কিন্তু কলিগস –আত্মীয় স্বজন এদের চাপাচাপিতে জিডি করতে বাধ্য হলাম ।কারন বিষয়টা রহস্যজনক ।এক পয়সার জিনিস চুরি হয়নি ,আবার পাশের রুমেও কিছু হয়নি কাজেই গন্ধটা ছিল সন্দেহের ।আমাকে আমার বোন ওই রাতেই নিয়ে এলো ওর সাথে ।এবং বাড়িওয়ালার ছেলেকে ফোন করে জানিয়ে এলাম আগামী মাসের এক তারিখ থেকে ছেড়ে দিচ্ছি আপনাদের বাসা।

কিন্তু মজার ব্যাপার কি জানেন ,পাশের রুমে ওই মেয়েদের একজন কিন্তু এখোনো দিব্যি  রয়েছেন।তাও একা।এত বড় একটা  ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে যাবার পর একা কি থাকা সম্ভব ? কি আপনারা কি কোনো মিশর রহস্য অথবা কাকাবাবু কিম্বা ফেলুদার গন্ধ পাচ্ছেন ?আমার অপরাধ একটাই আমি শুধু মাস শেষে ওতোগুলো টাকা ভাড়া দিব ,সারা দিন থাকি না কোনো পানি বিদ্যুৎ খরচ হবে না ,রাতে এসে শুধু ঘুমাবো কিন্তু বিপদ আপদে কেউ আমার কাছে আসতে পারবে না।লাভ টা কার ? বাড়িওয়ালার ।পুরো ফাঁকির ওপর ইনকাম  (আয়) ।

কিন্তু না সবাই এক রকম হয়না ।আমি একই বাসায় প্রায় ১৫ বছর থেকে এলাম ।একজন বাড়িওয়ালা এবং একটা পাড়া ছেড়ে আসাতেও যে এত কস্ট এবং মায়া তা আগে বুঝিনি।এখনো তারা খোঁজ নেন- খবর রাখেন এবং যাদের সঙ্গে থাকতাম তারাও এসে আমার কাছে থাকে ।একে ভালোবাসা বলে প্রেম বলে হৃদ্যতা বলে।কাজেই শিক্ষিত পাড়া আর টাকাওয়ালা পাড়ার মধ্যে ব্যাপক ব্যবধান।সেই সাথে পার্থক্য আরেকটা সেটা হলো আধুনিক শিক্ষা ও মননশীলতার।

কাজেই দেখুন এই কঠিন শহরে একটা নিজো ফ্ল্যাট থাকা কতোটা জরুরি !কেন কিছু ছেলে এবং তাদের অভিভাবকেরা ফ্ল্যাটওয়ালা বাবার কন্যা খোঁজেন বেশ বুঝতে পারছি। সব ছেলে বা মেয়ে  তো আর ফ্ল্যাট পাবার যোগ্য নয় অথবা তাদের কেনার ও ক্ষমতা নেই ।কাজেই আমাদের মতো মধ্যবিত্ত মানুষগুলোর জন্য এমন কোনো ব্যবস্থা সরকার এবং ব্যাক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো করুন যাতে আমাদের অন্তত লাইফ সিকিউরিটিটা থাকে।দ্বারে দ্বারে এভাবে ঘুরতে না হয় ভিকারীর মতো।এবং রহস্য উম্নোচন করার জন্য লাগে না কোনো ক্রাইম রিপোর্টার ,লাগেনা কোনো কাকাবাবু আর ফেলুদা ।জয় হোক মানবতার ।পৃথিবী সেজে উঠুক মহৎ মানুষের দেয়াল চিত্রে ।

Leave a Reply