আফসারা তাসনিম

তখন পূর্ব দিকে কেবল সূর্য উঁকি দিচ্ছে। ভাঙাচোরা সড়কগুলো দিয়ে গাড়ি ছুটে চলছে। সড়কগুলোতে যানজট নেই বললেই চলে। দেখতে দেখতে বিমানবন্দরের কাছাকাছি এসে গাড়িটা থেমে গেলো। সেই গাজীপুর থেকে গাড়িটা আমাদের সাথেই আসছিলো। আরও তিনজন উঠে বসলেন গাড়িতে। তখন গাড়ির গতি আরও বাড়ল। আমি জানালার কাচটা নামিয়ে দেখলাম। কি একটা স্নিগ্ধ ভাব চারপাশে। প্রতি ঘণ্টায় ৬০ মাইল গতিতে ছুটছিল গাড়িটা। মনে হচ্ছিল, আমরা যেন উড়ছি। আমাদের গন্তব্য গুলশান। ঠিক তখনই গাড়ি, ট্রাক আর বাসের ভিড় হঠাৎ আমাদের পথ আটকে দাঁড়াল। অবশেষে আমাদের গাড়ির গতি কমল। আমরা আবার ঢাকা শহরের যানজটে ফিরে এলাম। আমরা থামলাম, একটু চলতে চলতে আবার থামলাম। ভিড়ের কারণটা বুঝতে পারলেও আমাদের কিছু করার ছিলো না। অমি বাইরে তাকিয়ে দেখলাম পাশাপাশি যে গাড়িটা আসছিলো ওটাকে আর দেখা যাচ্ছে না। গাড়ির স্রোতে হারিয়ে গিয়েছে হয়তো । কিছুক্ষন পর আমরা আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম। হঠাৎ চোখে পড়লো ১৬ সিটের সেই মাইক্রোবাসটা থেকে নামছে আমার পরিচিত একজন। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম- কেমন আছেন আপা? খুব অপ্রস্তুত ভাবে উত্তর এলো এইতো। শুধু বললো কার্ডটা পাঞ্চ করে আসছি। প্রতিদিন সকাল ছয়টায় রওনা দিয়ে নয়টায় এসে অফিসে ঢুকি। গাজীপুর থেকে টংগী আসি ৪০ মিনিটে আর বাকী দেড় থেকে দুই ঘন্টা লাগে এই পথটুকু আসত এভাবেই বর্ণনা দিচ্ছিলেন একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ইসমত আরা। এটা শুধু ইসমত আরার অভিযোগ না। ঢাকাবাসীর সঙ্গে কথা বললে বোঝা যাবে যানজট যে আসলে কতটা ভয়াবহ হতে পারে। ঢাকার নাগরিক জীবন মানেই গড়পড়তা জ্যাম ঠেলে অফিস যাওয়া, আবার অফিস থেকে জ্যাম ঠেলে বাসায় ফেরা। এমন স্ট্রেসফুল জীবন বিশ্বের আর কোথাও আছে বলে মনে হয় না। উন্নত বিশ্বের বড় বড় শহরে স্ট্রেস থাকলেও সেখানে স্ট্রেস কাটানোর নানা ব্যবস্থা আছে। কিন্তু ঢাকায় একটা মধ্যবিত্ত পরিবারে বসবাসরত মানুষের স্ট্রেস কমানোর জন্য পর্যাপ্ত জায়গা এবং সুযোগ নেই বললেই চলে। এখানে নগরবাসীরা প্রতিদিন প্রায় তিন-চার ঘন্টা সময় ব্যায় করে রাস্তায় জ্যামে বসে থেকে। এই শহরে সকাল-সন্ধ্যার যাত্রা, সে তো রীতিমতো মতো একটা যুদ্ধ বললেও ভুল হবে না। আবার একই রাস্তায় অন্যান্য সময়ের চিত্র একেবারে আলাদা। যেমন, ভর দুপুরে রাস্তা বেশ ফাঁকা থাকায় খুব সহজেই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে যাওয়া যায়। অন্য শহরগুলোতেও, রাস্তার ওপর গাড়ি চলছে রিকশা চলছে। আছেন পথচারীও। কোনো উপলক্ষে রাস্তা বন্ধ থাকলে সেখান দিয়ে যাওয়া যায় না। কিন্তু ঢাকার চিত্র সম্পূর্ন ভিন্ন। এখানে রাস্তার যানজট একেবারে সীমার বাইরে। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি এমন ব্যাপক ও স্থায়ী যে, এটা এ শহরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে মিশে গেছে। এটাই এ শহরের একটা স্বাভাবিক স্থায়ী রূপ যা কখনো শেষ হওয়ার কোন সম্ভবনা কেও খুঁজে পাচ্ছে না। কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে প্রায় প্রতিদিনই মানুষ ঢাকামুখী হচ্ছে। ফলে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে ঢাকার উপর বিভিন্ন দিক থেকে চাপ পড়ছে। যা যানজটের একটি অন্যতম কারণ। পরিসংখ্যান বলছে, মানুষের জীবিকা অর্জনের পথ খুঁজতে প্রতিদিন ঢাকায় যুক্ত হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ মানুষ। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৮০ শতাংশ ঢাকা, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জে কেন্দ্রীভূত। শিল্পায়নের কারণে মূলত এসব জেলায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। সেজন্য ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে শিল্পকারখানা স্থাপন করে কর্মসংস্থান তৈরির পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এতে করে একদিকে যেমন মানুষের কর্মসংস্থান তৈরী হবে তেমনি ঢাকার উপর সামগ্রিক চাপ কমবে।

Leave a Reply